ঢাকা , শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ , ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টোল ছাড়াই গঙ্গামতির সৈকত ছুঁয়ে বিকল্প পথে কুয়াকাটা

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৩-১০-২০২৬ ০৪:২৫:১১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৩-১০-২০২৬ ০৪:২৫:১১ অপরাহ্ন
টোল ছাড়াই গঙ্গামতির সৈকত ছুঁয়ে বিকল্প পথে কুয়াকাটা ফোকাস বাংলা নিউজ
কুয়াকাটার পথে এবার যাত্রাটাই হতে পারে ভ্রমণের বড় একটি অংশ। পটুয়াখালীর কলাপাড়া শহর পেরিয়ে যানবাহনের ভিড় এড়িয়ে মসৃণ সড়কে এগিয়ে যাওয়া, পথের দুই পাশে সবুজ প্রকৃতি দেখা, তারপর পর্যটনপল্লী গঙ্গামতির সৈকতে গিয়ে সাগরের মৃদু ঢেউ আর নির্মল বাতাসে কিছুটা সময় থেমে থাকা—এরপর সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্ত দেখে আবার কুয়াকাটার পথে যাত্রা। সবচেয়ে বড় কথা, এ বিকল্প পথে নেই কোনো সেতুর টোল।

কলাপাড়া থেকে কুয়াকাটায় যাওয়ার প্রচলিত পথের বাইরে এই বিকল্প সড়কটি প্রায় দেড় বছর আগেই সংস্কার করা হয়েছে। আগে যেখানে ছিল খানাখন্দ আর পথের ভোগান্তি, এখন সেখানে মসৃণ সড়ক। পথটি তুলনামূলক ১০-১২ কিলোমিটার বেশি হলেও নেই টোলের ঝামেলা। নেই যানবাহনের তেমন ভিড়ও। ফলে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে পথটি হয়ে উঠতে পারে বাড়তি আনন্দের একটি সুযোগ।

কলাপাড়া পৌরশহর থেকে বর্তমানে কুয়াকাটার পথে তিনটি সেতুতে টোল দিতে হয়। কিন্তু শহরের মধ্য দিয়ে কিংবা নাচনাপাড়া চৌরাস্তা হয়ে বালিয়াতলী-গঙ্গামতি পথ ধরে কুয়াকাটায় গেলে সেই টোল দিতে হয় না। এলজিইডি নির্মিত আন্ধারমানিক নদীর সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুসহ আমতলী ও অনন্তপাড়ার সেতু পেরিয়ে এই বিকল্প পথে এগিয়ে যাওয়া যায়। পুরো পথটিই এখন তুলনামূলক মসৃণ ও আরামদায়ক।

তবে এ পথের আসল আকর্ষণ শুধু টোলমুক্ত যাত্রা নয়—পথের মাঝেই রয়েছে পর্যটনপল্লী গঙ্গামতি।

গঙ্গামতি সৈকতে পৌঁছালেই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। সাগরের মৃদু ঢেউ, নির্মল বাতাস, পরিচ্ছন্ন ও বর্জ্যমুক্ত পরিবেশ আর সৈকতের কোলঘেঁষা ঝাউবাগান মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক আবহ। জোয়ার-ভাটায় সৈকতের বিস্তৃত বেলাভূমি হয়ে ওঠে দীর্ঘ ওয়াকিং জোন। সমুদ্রের ঢেউয়ের ভাঙনের তাণ্ডবও এখানে তুলনামূলক কম।

প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এ সৈকতের রয়েছে আরও একটি বিশেষত্ব। পশ্চিমে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা যায়, আবার সৈকতের বিভিন্ন স্থান থেকে দেখা মেলে সূর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য। বেলাভূমিজুড়ে রয়েছে আঁকাবাঁকা চর। এসব চরে জেলেদের মাছ আহরণের দৃশ্যও পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। স্বল্প সময়ের জন্য ভাড়াটে মোটরবাইকে যেতে পারেন কাউয়ার চর এলাকায়। সেখানটাকে বর্তমানে স্থানীয়রা মিনি সুইজারল্যান্ড বলে বেড়াচ্ছেন।

স্থানীয় জেলে কামাল হোসেনের ভাষ্য, গঙ্গামতির চর দিন দিন আরও বাড়ছে। বাড়ছে বাগানও।

সৈকতের কোলঘেঁষে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট দোকানপাট। ভোরের খিচুড়ির স্বাদের কারণে জায়গাটির নামই হয়ে গেছে ‘খিচুড়ি পয়েন্ট’। এখানে ডাব, চা-কফি থেকে শুরু করে খাবার হোটেল—সবই রয়েছে। তবে কুয়াকাটার মূল সৈকতের মতো এখানে এখনো তেমন কোলাহল নেই। নিরিবিলি পরিবেশে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি সময় কাটানোর সুযোগই গঙ্গামতির অন্যতম আকর্ষণ।

সৈকত দেখা শেষে ভ্রমণপিপাসুরা যেতে পারেন রাখাইন পল্লী মিশ্রিপাড়ায়। সেখানে রয়েছে বৃহৎ সীমা বৌদ্ধবিহার। বিহারের ভেতরে রয়েছে প্রায় শত বছরের পুরোনো গৌতম বুদ্ধের ধ্যানমগ্ন মূর্তি। প্রায় ৩২ ফুট উচ্চতার এ মূর্তিকে রাখাইনরা এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বুদ্ধমূর্তি বলে দাবি করেন।

বৌদ্ধবিহারের পাশেই রয়েছে রাখাইন মার্কেট। সেখানে পাওয়া যায় রাখাইনদের নিজস্ব তৈরি কাপড়-চোপড় ও বিভিন্ন সামগ্রী। রয়েছে রাখাইন জাদুঘরও। বিহারাধ্যক্ষ উত্তম ভান্তে জানান, এবারে এই বৌদ্ধবিহারের শতবর্ষ পূর্তি উৎসব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গঙ্গামতি ও মিশ্রিপাড়ার দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে এরপর গন্তব্য করা যায় কুয়াকাটাকে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত পথের তুলনায় প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু পুরো যাত্রাটিই হবে টোলমুক্ত এবং তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যের।
পথের দুই পাশে দেখা মিলবে উপকূলের প্রকৃতি ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের। গঙ্গামতিতে রাতযাপনের জন্য রয়েছে একটি রিসোর্ট ও কটেজ। সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে রাতদিন অবস্থানের সুযোগ রয়েছে। আর ধোলাইর মার্কেটে সাগরের তরতাজা মাছ পাওয়া যায় ২৪ ঘণ্টাই। অপেক্ষাকৃত কম খরচে তাজা সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার সুযোগও রয়েছে এখানে।

কলাপাড়া থেকে কুয়াকাটার যাত্রায় তাই এই বিকল্প পথটি এখন শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর রাস্তা নয়; বরং হয়ে উঠেছে আলাদা একটি ভ্রমণপথ। কিছুটা বেশি পথ, কিন্তু টোল নেই। যানজট নেই। আছে গঙ্গামতির সৈকত, লাল কাঁকড়া, ঝাউবাগান, চর, জেলেদের জীবন, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, ম্যানগ্রোভ বন, রাখাইন সংস্কৃতি এবং শতবর্ষী বুদ্ধমূর্তি। সব মিলিয়ে এক যাত্রায় যেন পাওয়া যাচ্ছে কয়েকটি ভ্রমণের স্বাদ।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুজ্জামান জানান, গঙ্গামতি সৈকতে বিদ্যুৎ সুবিধা, ওয়াশরুমসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গাড়ি নিয়ে সৈকতের বেলাভূমে যাওয়ার জন্য লেকের ওপর গার্ডার ব্রিজ করা হয়েছে।

তাই কুয়াকাটা যেতে চাইলে এবার সরাসরি গন্তব্যে ছুটে না গিয়ে পথটাকেও উপভোগ করা যায়। কলাপাড়া থেকে গঙ্গামতি হয়ে কুয়াকাটা—অতিরিক্ত কয়েক কিলোমিটার পথ, কিন্তু তার বিনিময়ে মিলছে টোলমুক্ত যাত্রা আর উপকূলের প্রকৃতির সঙ্গে কিছুটা বেশি সময় কাটানোর সুযোগ।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ